home
Home
feed
Search Posts by Tag
info
About Me
কিছু আকর্ষণীয় জিনিস যেগুলো শিখলাম ‘বাংলা ভাগ হলঃ হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ-বিভাগ’ থেকে

কিছু আকর্ষণীয় জিনিস যেগুলো শিখলাম ‘বাংলা ভাগ হলঃ হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ-বিভাগ’ থেকে

আমি কিছু দিন আগে জয়া চ্যাটার্জীর বই ‘বাংলা ভাগ হলঃ হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ-বিভাগ’ পড়লাম আর অনেক আকর্ষণীয় জিনিস শিখলাম যেগুলো অন্যদেরও জানাতে চাই – আমরা কতো তর্ক করি দেশ-বিভাগ নিয়ে, কতো নিশ্চিতভাবে কিছু লোকেদের দোষ দি আর অন্যদের নির্দোষ বলি, কিন্তু আমাদের মধ্যে কতো লোক আসল বেশি কিছু জানে এই ইতিহাস নিয়ে ? তাই জন্যে এই পোস্টটা লিখলাম, যাতে আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুগগুলোর একটা আরো ভালো বুঝতে পারি ।

ভারতের বিভাজন নিয়ে কথা বলার আগে, একটা গল্প বলতে চাই বাল্কান্স থেকে । ইয়ুগস্লাভিয়া ভেঙ্গে পড়ার পর,নতুন দেশগুলোর কিছু জাতীয়তাবাদী নেতারা অনেক মারকাট করে তাঁদের পাশের রাজ্যগুলোকে ধকল করে নেওয়া চেষ্টা করছিলেন । অনেক বেসামরিক নাগরিকরা মরছিলেন এই যুদ্ধগুলতে, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (যে সাধারণত খুব ইচ্ছুক থাকে অন্য দেশে হস্তক্ষেপ করতে) হাত তুলল না এই রক্তপাত বন্ধ করতে অনেক দিন ধরে যদিও তাদের অনেক বেশি ক্ষমতা ছিল সার্বিয়া আর বস্নিয়ার চেয়ে । কেন এত দিন লাগল কিছু করতে? এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল যে বিল ক্লিন্টান (তখনকার রাষ্ট্রপতি) এক বই পড়েছিলেন, রবার্ট ক্যাপ্লেনের ‘বাল্কেন ঘোস্টস’, যেটা শেখাল যে ইয়ুগস্লাভিয়ার সব সাম্প্রদায় এক অন্যকে ঘৃণা করে প্রচীন বিদ্ধেষের জন্য যেটা কখনো ধ্বংস করা যাবে না । কাজেই ক্লিন্টান বিশ্বাস করতেন যে, যতই না চেষ্টা করুক ভালো নেতারা, কেউ সেখানকার বেসামরিক নাগরিকদের বাঁচাতে পারবেন না । এই মতবেদটা পালটালেন অতিরিক্ত দেরিতে (যেটার জন্য অনেক লোক অকারণে মরল), আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর তার মিত্ররা সেনাবাহিনী পাঠাল তার পর , কারণ এত গণহত্যা হচ্ছিল যে আর বসে থাকতে পারছিলেন না আর (দ্বিতীয় কারণ যেটা বেশি লোক জানেন না) তিনি আরেক বই পড়লেন এবার (নোওেল ম্যাল্কমের ‘বস্নিয়াঃ এক ছোটো ইতিহাস’) যেটা সত্য বললোঃ ইতিহাসের সব যুদ্ধ আর গণহত্যা মানুষের হাতেই হয়, আর ‘প্রচীন বিদ্বেষ’-কে দোষ দিয়ে নিজের কাজের দায়িত্ব থেকে কেউ পালাতে পারে না । যদিও সেই বাল্কান্সের নেতাগুলো প্রচীন বিদ্বেষ থেকে শুরু করলেন, বিদ্বেষটা বাড়ালেন তাঁরা এবং তাঁরাই যুদ্ধগুল শুরু করলেন ।

এই গল্পটা বললাম কারণ আমাদের সমাজে অনেক লোক আছে যারা খুব সরলীকৃত বর্ণনা ছড়ান ভারতের বিভাজন সম্পর্কে ঃ যে হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে যেগুলো কখনো সমাধান করা যাবে না, যে দেশ বিভাগ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না, আর যে মুসলমানদেরই পুরো দোষ । এটা হচ্ছে হিন্দুত্বর সমর্থকরা যেভাবে ইতিহাস শেখাতে চায়ছেন । সত্য হচ্ছে যে ভারতের বিভাজন হল সে সময়ের লোকেদের (হিন্দু এবং মুসলমান দুটোরই) কাজের জন্য আর তাঁদের খারাপ কাজ,রাজনৈতিক সুবিধাবাদী, এবং সাম্প্রদায়িকতা ছিল দেশ বিভাজনের কারণ – কুরান, মহাভারত, ও মুঘল সময়ের ইতিহাসে আসল কারণগুলো পাওয়া যাবে না (যতই বিজেপি চেষ্টা করুক) । আমি আশা করি যে আমার পোস্টটা (আর জয়া চ্যাটার্জীর বইটা, যদি কেউ এটা পড়ে অনুপ্রেরণা পান পুরো বইটা পড়তে) সত্যি ইতিহাসটাকে বোঝাতে পারে আর আমাদের আলোচনাকে আরেকটু যুক্তিসঙ্গত হতে পারে ।

অর্থনৈতিক পরিবর্তন দেশ-বিভাগের আগে

সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যজনক জিনিস যেটা শিখলাম ছিল যে সাম্প্রদায়িকতা আর শ্রেণী সংঘাটের মধ্যে অনেক সংযোগ ছিল । বইটা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল এটা এক পুরোপুরি অন্য দুনিয়া যেটা কেউ আমাকে আগে বলেনি যে ছিল এক যুগে । অনেক কিছু ভুল শিখেছিলাম বা জানতাম না বইটা পড়ার আগে । কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে বলার আগে, অর্থনৈতিক অবস্থাটা প্রথম বোঝাতে হবে ।

জমিদারদের ক্ষমতা কমতে শুরু করেছিল দ্রুত ১৯৪৭-এর আগে থেকেই । অনেক জমিদাররা শিক্ষা পেয়ে কোলকাতায় চলে গেলেন যেখানে সংস্কৃতি (ভদ্রলোকই তো ছিলেন) আর রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল (আগে মফস্বলের রাজনৈতিক গুরুত্ব তার জনসংখ্যার চেয়ে কম ছিল কারণ খালি জমির মালিকরা ভোট দিতে পারতেন) । যাতে বর্গাদারদের থেকে টাকা বানাতে থাকতে পারতেন, জমিদাররা কিছু ধনী কৃষকদের থেকে খাজনা নিতে শুরু করলেন আর তাঁদের অধিকার দিলেন বাকি কৃষকদের থেকে খাজনা নেওয়ার । এইভাবে জমিদাররা টাকা কামাতে পারতেন, কিন্তু গ্রামে থাকতে হত না যেখানে ভদ্রলোক সংস্কৃতি আর রাজনীতি ঠিক উপভোগ করতে পারতেন না । এই ধনী কৃষকগুলো এবার নিজেই খাজনা নিতে শুরু করলেন অন্য কৃষকদের থেকে (আইরনিক), আর তাঁদের বলতেন ‘জোতদার’।

আমি এই বইটা পড়ার আগে বিশ্বাস করতাম যে জমিদাররা পুরো গ্রামীণ অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন, আর তাঁদের নিচে সব কৃষকরা গরিব আর ক্ষমতাহীন ছিলেন – এটা ভুল বিশ্বাস ছিল । সত্য হচ্ছে যে, ১৯৩৭ সাল নাগাদ , জোতদারদের ক্ষমতা এই অনুপস্থিত জমিদারদের চেয়ে বেশি ছিল, আর শুধু যে জমিদারগুলো গ্রামে থাকতেন এখনো শক্তিশালী ছিলেন । জোতদাররা গরিব কৃষকদের থেকে যে খাজনা নিতেন, তার চেয়ে কম জমিদারদের পাঠাতেন, তো আস্তে আস্তে তাঁরা আরো ধনী হতে শুরু করলেন সেই অনুপস্থিত জমিদারগুলোর চেয়ে । মহামন্দার পর, জমিদারদের ক্ষমতা আরোও পড়ল কারণ খাবারের দাম এত পড়ল যে কৃষকরা আর খাজনা দিতে পারছিলেন না যদি না ঋণ নিতেন । তার কারণে, অনেক জোতদার আর কৃষকরা অনুপস্থিত জমিদারগুলোকে খাজনা দেওয়া বন্ধই করে দিলেন (জমিদার কি করবেন, সে তো আর সেখানে থাকেই না!), আর সেই জমিদারগুলো আর টাকা বানাতে পারছিলেন না তাঁদের জমি থেকে । অন্যদিকে, জোতদাররা খাজনা নিতে থাকতে পারলেন কারণ তাঁরা মফস্বলেই থাকতেন আর আরো সহজে কৃষকদের খাজনা দেওয়ার জন্য চাপ দিতে পারতেন । জোতদারদের ক্ষমতা আরো বাড়ল কারণ তাঁরা মহাজনি শুরু করলেন এক সময়ে যখন অনেক গরিব কৃষকদের ঋণ নিতে হচ্ছিলেন বাঁচার জন্য – অর্ধেক জমিদাররা এই উপায়টার থেকে টাকা কামাতে পারেননি কারণ শহরে থাকতেন, সেই কৃষকগুলোর থেকে অনেক দুরে ।

আপনারা নিশ্চয় ভাবছেন, এটার কি সংযোগ আছে সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে? কোনোই বেশি সংযোগ ছিল না ১৯৩০-র আগে কারণ অর্ধেক কৃষকরা ভোট দিতে পারতেন না (জমি দরকার ছিল), আর হিন্দু জমিদাররা নির্বাচনগুলো সহজে জিতত । কিন্তু ১৯৩০-র পর, কয়েক আইন বানানো হল যেগুলো জমিদারদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ভাঙল আর মুসলমান জোতদার আর কৃষকদের আরো ক্ষমতা দিল মফস্বলে । ভারত শাসন আইন (১৯৩৫) জমি মালিকানার প্রয়োজনীয়তা কমাল যাতে আরো মুসলমান জোতদার আর কৃষকরা ভোট দিতে শুরু করলেন, আর সাম্প্রদায়িক বাঁটওয়ারা বানাল পৃথক নির্বাচনমণ্ডলী, যাতে মফস্বলের অর্ধেক আসনগুলোতে খালি মুসলমানরা ভোট দিতে পারতেন মুসলমান প্রার্থীদের জন্য ।

এবার যে গরিব কৃষকরা এত দিন জমিদারদের উপর রেগে ছিলেন, যারা মহামন্দার সময় খেতে পারছিলেন না, তাও জমিদারদের খাজনা দিতে হচ্ছিলেন, তাঁরা ভোট দিতে পারলেন – অবশ্যই, এটার জন্য অনেক দল উঠল যেগুলো জমিদারদের বিরুদ্ধে ছিল । আর জোতদারদের ওটার জন্য,টাকার এক উৎসও ছিল সেই দলগুলোর জন্য । অনেক মুসলমান কৃষকরা নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতিকে সমর্থন করতে শুরু করলেন, এক দল যেটা বর্গাচাষীদের স্বার্থর সুরক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল । যদিও শুরুর নেতাগুলোর মন ভালো ছিল, যখন এই নতুন আইনগুলো বেরোল, সব ধরণের মুস্লিম নেতারা এই দলটাতে ঢুকলেন কারণ আশা করছিলেন যে তাঁরা এই নতুন মুস্লিম নির্বাচকমণ্ডলী থেকে সমর্থন পাবেন । নিখিল বঙ্গ প্রজা সামিটির অনেক নতুন নেতাগুলো কৃষকদের নিয়ে ভাবছিলেন না আর খালি নিজেদের ভোট নিয়ে, আর তাঁদের মধ্যে অনেক ছিলেন জোতদার (যারা জমিদারদের ক্ষমতা কমিয়ে নিজেদের ক্ষমতা বাড়াবার চেষ্টা করছিলেন) আর শক্তিশালী নগর রাজনীতিবিদরা । দলটার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য লড়াই শুরু হল (যেটা নিয়ে জয়া চ্যাটার্জী মজার ভাবে লিখেছেন ‘বাঙালির মধ্যে যা হয় তা-ই শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল’), কাজেই ফজলুল হক দলটা ছেড়ে তাঁর কৃষক প্রজা পার্টি বানাল (যেটা দলটার পরায় সব কৃষক সমর্থন পেল) আর দলটার বাকি লোক মুস্লিম লিগে ঢুকল কিছুক্ষণ পরে ।

সাম্প্রদায়িকতা কিকরে অর্থনৈতিক কারণের জন্য বাড়তে শুরু করল

ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি খুব জনপ্রিয় ছিল কৃষকদের মধ্যে, কাজেই মুস্লিম লিগের মুশকিল হচ্ছিল মফস্বলে ভোট পেতে । মুস্লিম লিগের অনেক নেতারা নিজেই জমিদার আর তালুকদার ছিলেন, তো কৃষক প্রজা পার্টির মতন জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার উপায় ছিল না, কিন্তু তাঁরা তাড়াতাড়ি অন্য রাস্তা পেলেনঃ সাম্প্রদায়িকতা । যেখানে কৃষক প্রজা পার্টি বলছিল নিজের শ্রেণি নিয়ে ভেবে ভোট দিতে, মুস্লিম লিগ বলছিল যে মুস্লিমদের উচিত নিজের ধর্ম নিয়ে ভেবে ভোট দিতে (যদিও নিজের সাম্প্রদায়েরই লোক অর্থনৈতিক অত্যাচার করছিলেন তাঁদের উপর) ।

অন্যদিকে কংগ্রেসের অবস্থা খারাপ ছিল কারণ তাদের অনেক নেতারা জমিদার ছিলেন, আর জমিদাররা তাঁদের সবচেয়ে বড় টাকার উৎস । কংগ্রেসের নেতারা সব সাম্প্রদায়িক বাঁটওয়ারার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে শুরু করলেন (যদিও কংগ্রেস কার্যনির্বাহী সমিতি বলল এটা না করতে কারণ তাঁদের ভয় ছিল যে মুস্লিমরা খেপে যেতেন), কারণ রেগে গিয়েছিলেন যে হিন্দু ভদ্রলোকদের ক্ষমতা কমান হয়েছিল । এটা নিজে থেকেই খারাপ ছিল না, কারণ সাম্প্রদায়িক বাঁটওয়ারা মুসলমানদের যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়েছিল, সেটা তাঁদের জনসংখ্যার একটু বেশি ছিল, আর পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীগুলর কারণ সম্ভাবত ছিল ‘ভাগ কর এবং শাসন কর’ । অথচ, সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারার বিরুদ্ধে আন্দোলনটা নিজেই খুব একটা সাম্প্রদায়িক চরিত্র নিলো, কারণ হিন্দুদের যুক্তি ছিল না যে ‘সাম্প্রদায়গুল ভাগ করা বাজে’ বা ‘রাজনৈতিক ক্ষমতা জনসংখ্যার মতন হওয়া উচিত’ – তাঁদের অবস্থান ছিল ‘মুসলমানদের কোনোই ক্ষমতা থাকা উচিত নয় কারণ হিন্দুরা শ্রেষ্ঠ’ । সাম্প্রদায়িক বাঁটওয়ারার বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে, হিন্দুরা নিজেই খুব সাম্প্রদায়িক হয়ে গেলেন । ব্রিটিশরা সফল হলেন তাঁদের লক্ষ্যতে ঃ বাঙালিদের দেশের ভাবনাটা মিঠিয়ে, সাম্প্রদায় নিয়ে যুদ্ধ শুরু করান ।

জমিদারদের ভয় ছিলেন যে মুসলমানরা যদি ক্ষমতা পান, তাঁদের অর্থনৈতিক অত্যাচার বন্ধ হয়ে যেত (এটাই কৃষক প্রজা পার্টি করার চেষ্টা করছিল), কাজেই সাম্প্রদায়িক বাটওয়ারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন । অথচ, এই অর্থনৈতিক লড়াইটা খুব তাড়াতাড়ি সাম্প্রদায়িক করে দিলেন হিন্দু ভদ্রলোকরা কারণ নাহলে গরিব হিন্দুদের সাহায্য পেতেন না (গরিব লোকের কি আগ্রহ আছে জমিদারদের সুরক্ষা করাতে?)।

কংগ্রেসের মধ্যে লড়ালড়ি

সাম্প্রদায়িক বাঁটওয়ারার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে খালি হিন্দু ভোট (আর তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগ বড়লোক হিন্দুদের) পাওয়া যাচ্ছিল । কংগ্রেসের এবার কৃষকদেরও ভোট দরকার ছিল যবে থেকে ভারত শাসন আইন তাঁদের ভোট দিয়েছিল, যদিও জমিদাররা চায়ছিলেন না “চাষা ভূষা কুলি মজুর”-দের সঙ্গে মিশতে । কাজেই, শরৎচন্দ্র বসু (তখন বাংলা কংগ্রেসের সভাপতি বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে) কৃষকদের ভোট জেতার চেষ্টা শুরু করলেন আর প্রতিশ্রুতি দিলেন খাজনা আর ঋণ কমাতে তাঁদের জন্য । অথচ, কংগ্রেসের এত দরকার ছিল জমিদারদের টাকা (আর তাঁদের নেতাদের মধ্যেও এত জমিদার ছিলেন) যে কৃষক প্রজা পার্টির মতন আমূল প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি । মফস্বলে কংগ্রেস কিছু আসন পেল, কিন্তু খুব কম, আর অর্ধেক পেল কৃষক প্রজা পার্টি ।

১৯৩৭ নির্বাচন হারার পর কংগ্রেসের সমস্যা অনেক বাড়ল । যদিও কংগ্রেস সবচেয়ে বেশি আসন পেল, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ পেল না । শরৎচন্দ্র বসু চায়ছিলেন কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে সরকার চালাতে, কিন্তু এই জোটটা বানাতে পারেননি (কোনো এক কারণ নেই যেটা তাড়াতাড়ি বোঝাতে পারি এখানে – পুরো বইটা পড়ুন যদি আরো জানতে চ্যাঁন) । কাজেই, কৃষক প্রজা পার্টি আর মুস্লিম লিগ একসঙ্গে সরকার চালাল ১৯৩৭ নির্বাচনের পর । মুস্লিম লিগেও অনেক জমিদার ছিলেন, কিন্তু তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন ফজলুল হকের আমূল নীতিগুলো সমর্থন করার জন্য কারণ তাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা হেরে, আরো রাজনৈতিক ক্ষমতা পাচ্ছিলেন । অথচ, কংগ্রেসের জমিদাররা অর্থনৈতিক ক্ষমতা হারছিলেন ফজলুল হকের নীতিগুলোর জন্য আর কিছুই পাচ্ছিলেন না ক্ষতিপূরণ হিসেবে । কৃষক প্রজা পার্টি জমিদারদের বারবার আক্রমণ করল – ঋণের সুদের হার সীমিত করল, খাজনা কমাল, আর জোতদারদের অধিকার দিল জমি কিনতে বা বিক্রি করতে বিনা জমিদারদের অনুমতি । জমিদাররা অনেক দিন ধরেই শরৎচন্দ্র বসুর উপর রেগে ছিলেন, যবে থেকে তিনি রাজনৈতিক বামের দিকে যেতে শুরু করলেন, কিন্তু এবার তাঁরা নতুন নেতা খুঁজতে শুরু করলেন যে তাঁদের অর্থনৈতিক স্বার্থ আরো ভালো সুরক্ষা করার চেষ্টা করবেন ।

এটার জন্য বাংলায় বসুর সমর্থন কমছিল, কিন্তু সবকিছু ভেঙ্গে পরল যখন সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেস সভাপতি হওয়ার নির্বাচন জিতল ১৯৩৯-এ । গান্ধী যে প্রার্থীটাকে চায়ছিলেন হারলেন, তো কংগ্রেস কার্যনির্বাহী সমিতির সব গান্ধীর সমর্থকরা (মানে, সবাই বসু ভাইদের বাদ দিয়ে, আর নেহরু যিনি নিজেকে আরেকটু বেশি ভদ্র দেখাবার চেষ্টা করলেন কিন্তু গান্ধীর সঙ্গেই ছিলেন) পদত্যাগ করলেন যাতে বসু ভাইদের কংগ্রেস ছাড়তে হল (যেন গান্ধীর সমর্থকরা বললেন ‘আপনারা যান, নাহলে আমরা পুরো দলটাই ধ্বংস করে দেব’) ।

কিন্তু সেখানে শেষ করলেন না গান্ধীর সমর্থকরা তাঁদের অবিচার । তাঁরা বসু ভাইদের সব সমর্থকদেরও দল থেকে বের করে দিলেন, যাতে আর কেউ গান্ধীর মতবেদের সঙ্গে লড়তেন না । এটা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ছিল, কিন্তু তার চেয়ে বেশি, অনিচ্ছাকৃতভাবে বাংলায় সাম্প্রদায়িকতা বাড়াল । বাংলা কংগ্রেসের অর্ধেক ধর্ম নিরপেক্ষ বা মুসলমান নেতারা ছিলেন শরৎচন্দ্র বসুর সমর্থক, কিন্তু তাঁদের বের করে দেওয়ার পরে, খালি সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা বাকি ছিলেন । কাজেই, দলটা এবার একটা খুব সাম্প্রদায়িক এবং হিন্দু চরিত্র নিলো । শরৎচন্দ্র বসুর কৃষক সমিতি আন্দোলনগুল বন্ধ হল, আর মুস্লিম ভোট জেতার চেষ্টা করা শেষ হল – এবার বাংলা কংগ্রেস খালি হিন্দু ভদ্রলোকদের রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক ক্ষমতা সুরক্ষা করার জন্য কাজ করছিল, আর কারুর জন্যে না ।

আরেক সমস্যা এলো যখন হিন্দু মহাসভা বাংলায় উঠতে শুরু করল । এই দলটা সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক ছিল আর জমিদারদের সমর্থক, কাজেই অনেক ধনী ভদ্রলোকরা কংগ্রেস ছেড়ে মহাসভার সমর্থক হয়ে গিয়েছিলেন যখন শরৎচন্দ্র বসুর সঙ্গে খেপে ছিলেন । অথচ, বসু ভাইদের বের করার পর, বাংলা কংগ্রেস দ্রুত মহাসভার মতন হয়ে গেল, যাতে সেই ধনী ভদ্রলোকগুলো তাড়াতাড়ি ফিরে গেলেন – দল বদল করার কারণটাই চলে গেল কারণ কংগ্রেস আর মহাসভার মতবেদ এবার একই ছিল (হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা) । বসু ভাইদের বের করা বাদ দিয়ে, অন্য কারণ আরো সাম্প্রদায়িক হয়ে যাওয়ার জন্য ছিল যে কংগ্রেসের দরকার ছিল যে টাকাটা মহাসভার কাছে চলে গিয়েছিল যখন সেই জমিদারগুলো দল বদল করল, কারণ নির্বাচন জেতা মুশকিল কম টাকায় । জমিদারদের টাকা ফেরত আনার জন্য, কংগ্রেস আরো আগ্রহ দেখাতে শুরু করল হিন্দু ভদ্রলোকদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বার্থে । কংগ্রেস আর মহাসভা একসঙ্গে কাজ করছিল শুরুতে কিন্তু আস্তে আস্তে মহাসভা কংগ্রেসের পেছন পেছন যেতে শুরু করল – একই মতবেদ, কিন্তু কংগ্রেসের আরো সমর্থক এবং ক্ষমতা ছিল তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ।

তখন পুরো বাংলায় সাম্প্রদায়িকতা বাড়তে শুরু করল কারণ কংগ্রেস, মহাসভা, এবং মুস্লিম লিগ সব সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালাচ্ছিল (অন্তত আগে কংগ্রেস করছিল না) । হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে হিংসতা বাড়ল, মুসলমানদের আর মনে হচ্ছিলেন না যে ভারতে থাকতে পারবেন কারণ হিন্দুরা সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক হয়ে গিয়েছিলেন আর হিন্দুদেরও সেটাই মনে হচ্ছিলেন মুসলমানদের সম্পর্কে । মুসলমানরা বিভাজনের জন্য আন্দোলন শুরু করলেন, আর কিছু হিন্দুরাও এটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন । যদি শরৎচন্দ্র বসু বা বাংলা কংগ্রেসের অন্য কোনো ধর্ম নিরপেক্ষ নেতা এখনো থাকত, হয়তো মুসলমানদের বোঝান যেত যে পাকিস্তানের দরকার ছিল না, আর হিন্দু এবং মুসলমানরা একসঙ্গে থাকতে পারতেন – অথচ, গান্ধী আর তাঁর সমর্থকদের জন্য এটা সম্ভব ছিল না কারণ হিন্দুদের খালি সাম্প্রদায়িক নেতাই বাকি ছিল । সেটার জন্য,বেশিরভাগ মুসলমানরা জিন্নাহকে বিশ্বাস করছিলেন যখন সে বলছিলেন যে বিনা পাকিস্তান, মুসলমানরা বাঁচতে পারতেন না ।

অগাস্ট ১৬ ১৯৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর, এই তিন দলগুলো সব বাংলার বিভাজনের জন্য আন্দোলন শুরু করল অনেক জোর দিয়ে । আমি (আর সম্ভবত অন্য অনেক বাঙালিরা) ভুল ভেবেছিলাম যে জিন্নাহ, সোহ্‌রাওয়ার্দী, আর মুস্লিম লিগই খালি চেয়েছিলেন বিভাজন, আর হিন্দুরা সম্পূর্ণ এটার বিরুদ্ধে ছিলেন । সত্য হচ্ছে যে অনেক হিন্দু বড়লোকরাও বিভাজন চায়ছিলেন যাতে হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকত, আর যাত জমিদারদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষা করা যেত । ছোটলোক হিন্দুরা বিভাজনের সমর্থন করলেন শুরুতে কারণ কংগ্রেস আর মহাসভা সাম্প্রদায়িকতা ছড়াছিলেন আর তাঁরা ভুল জিনিসগুলো বিশ্বাস করছিলেন, আর শেষের দিকে সমর্থন করতে শুরু করলেন আরোও হিন্দু কারণ দাঙ্গাগুলোর পর ধর্ম নিরপেক্ষ হিন্দুদেরও আর মনে হচ্ছিলেন না যে নিরাপদ থাকতে পারতেন এক রাজ্যতে যেখানে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিলেন ।

কিভাবে দলিত আর সাঁওতালদের সাম্প্রদায়িকতা বাড়ান হল

আরেকটা খুব আকর্ষণীয় জিনিস যেটা শিখলাম ছিল যে অনেক জল-অচল জাতিদের লোক এবং আদিবাসীরা সাম্প্রদায়িক হয়ে গিয়েছিলেন এই যুগে । তাঁরা ভদ্রলোক সমাজের মধ্যে ছিলেন না, আর আমি ভাবতাম যে এই লড়ালড়িতে তাঁদের কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক লাভ ছিল না । অথচ,তখনকারের হিন্দু ভদ্রলোকরাও এটা বুঝলেন আর এটা ঠিক করার চেষ্টা করলেন – নৈতিকতার জন্য না (যদিও কিছু নেতারা এটার জন্য করলেন), ভোট জেতার জন্য । পুনা চুক্তির জন্য তফসিলি জাতি আর আদিবাসীরা কিছু সংরক্ষিত আসন পেলেন সরকারে, তো ভদ্রলোক হিন্দুরা ঘাবড়ে গেলেন – যদি তাঁরা তফসিলি জাতি আর আদিবাসী ভোটগুল না পেতেন, বাংলার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা যেত না । যাতে জল-অচল জাতি আর আদিবাসীরা ভদ্রলোক হিন্দুদের সমর্থন করতেন, কংগ্রেস আর মহাসভার অনেক নেতারা ‘শুদ্ধি’ করতে শুরু করলেন জল-অচল জাতির লোকেদের এবং আদিবাসীদের । শুদ্ধির অনুষ্ঠানের পর, জল-অচল জাতিদের লোক এবং আদিবাসীদের কিছু জিনিস করতে দিলেন যেগুলো আগে পারতেন না (যেমন ব্রাহ্মণদের জল বা খাবার বিক্রি করা) । এই নতুন সবর্ণ হিন্দুগুলো তাঁদের কিছু পুরনো প্রথাগুল ছাড়লেন (যেমন শূকর আর কিছু ধরণের পাকি খাওয়া), নতুন নাম নিলেন, আর তারপর তাঁরা ব্রাহ্মণদের সাথে মিশতে পারলেন ।

দলিত এবং আদিবাসীদের মর্যাদার এই উন্নতির বিনিময়ে, তাঁরা কংগ্রেসের প্রার্থীদের ভোট দিতে শুরু করলেন আর সাম্প্রদায়িক প্রচারণাগুলোতে সাহয্য করলেন । যাতে দেখাতে পারতেন যে এই মর্যাদার যোগ্য, তাঁরা অন্য হিন্দুদের চেয়ে আরো বেশি সাম্প্রদায়িক হয়ে গেলেন, আর অনেক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলোতে আদিবাসী এবং দলিতরা নেতা ছিলেন । আমি এটা পড়ে খুব অবাক হলাম – কিভাবে তাঁদের কামানের খোরাক হিসেবে ব্যাবহার করলেন সেই হিন্দু ভদ্রলোকগুলো । আরেকটা খারাপ জিনিস ছিল যে খারাপ ভাবে জাতপাতের বিরুদ্ধে আক্রমণ করলেন । এই নেতাগুলো বলেননি যে জাতপাত ভুল ছিল, যে লোকজনের স্বাধীনতা থাকা উচিত খেতে যা ইচ্ছে, আর যে সবাইকে সম্মান প্রদর্শন করা উচিত – তাঁরা বললেন যে জাতপাত ঠিক সিস্টেম ছিল, আর যে জল-অচল জাতিদেরই দোষ ছিলেন জল-অচল হওয়ার জন্য কারণ তাঁরা ভুল জিনিস খেতেন । ভালো যে কিছু আদিবাসী আর দলিতদের জীবনে উন্নতি হল, কিন্তু এই হিন্দু ভদ্রলোকগুলো তাঁদের শোষণ করছিলেন আর কামানের খোরাক হিসেবে ব্যাবহার করছিলেন যখন এই উন্নতিটা দিলেন, আর সেটা পড়ে আমার খারাপ লাগল ।

পোস্টের শেষ

অন্য অনেক আকর্ষণীয় জিনিস শিখলাম এই বইটার থেকে, কিন্তু সবকিছু নিয়ে লিখতে পারবো না । আশা করি যে আপনারা কিছু শিখেছেন এই পোস্টটার থেকে বা কিছু আনন্দ পেয়েছেন । আমাকে লিখতে পারেন যদি কিছু বলার আছে এই পোস্টটার সম্পর্কে, আমার ইমেল হচ্ছে chancellorceti <at> gmail.com ।