আমি কাল রাত্রে সত্যজিৎ রায়ের ১৯৬০ সিনেমা ‘দেবী’ দেখলাম আর খুব ভাল লাগল ।
সিনেমাটাতে একটা ১৭ বছর বয়সী মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যায় কারণ তাঁর সশুর এক স্বপ্ন দেখেছিলেন যেটাতে মেয়েটা (দয়াময়ী) মা কালির এক অবতার । সশুরটা তাঁকে ভগবানের মতন উপাসনা করতে শুরু করলেন, আর বাড়ির বাকি লোকজনের সাহস ছিলেন না বাড়ির ঠাকুরকে বলতে যে তিনি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন ।
মেয়েটা বেশি ভয় পাচ্ছিলেন ঠাকুরকে না বলতে, আর তার পর থেকে তিনি এক মুরতির মতন বসে থাকলেন আর বাড়ির সবাই তাঁর সামনে পুজো করতে লাগলেন । তিনির বর, উমাপ্রসাদ, অনেক শিক্ষিত ছিলেন আর এইসব জিনিসে বিশ্বাস করতেন না, কিন্তু সে কোলকাতায় পরছিলেন যখন এটা শুরু হল । শুরু থেকেই সিনেমাটাতে লড়াইটা দেখা যাচ্ছিল সে দুটো মতবেদের মধ্যে – উমাপ্রসাদের র্যাশনালিসেম এবং তিনির বাবার অন্ধ বিশ্বাস । উমাপ্রসাদ স্বপ্ন দেখছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, ভাবছিলেন কিভাবে বাঙ্গালি সমাজ এগুতে পারে, এদিকে তাঁর বাবা ১৭ বছর বয়সী মেয়েদের ভগবান করে দিচ্ছিলেন, তাঁর স্বপ্নগুলো প্রমাণ হিসেবে ব্যাবহার করছিলেন, আর ভয় পেতেন তাঁর ছেলের ওয়েস্টার্ন ভ্যালুজের থেকে ।
কিন্তু উমাপ্রসাদেরও সাহস ছিলেন না তাঁর বাবাকে বোঝাতে যে তিনি ভুল রাস্তায় যাচ্ছিলেন – এক বার বলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁর বাবা তাঁর মুখের উপর হাত চেপে দিলেন যাতে পাশের ঘরের পুজোতে কোনো অসুভিদে না হত । উমাপ্রসাদ আর লড়েননি, আর সেটার জন্য অবস্থাটা অনেক বেশি খারাপ হয়ে গেল । পাশের ঘরে, এক ভিখারি এসেছিলেন দয়াময়ীর কাছে কারণ ভাবছিলেন যে ‘মা’ তাঁর নাতিকে এক রোগ থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারতেন । এখানে খুব দুঃখ পাচ্ছিলাম কারণ জানতাম যে, যাই ঘটুক না কেন, কারুর ক্ষতি হত – যদি বাচ্চাটা বেঁচে যেত, দয়াময়ীর মধ্যে অন্ধ বিশ্বাসটা আরও বাড়ত, আর যদি বাচ্চাটা সুস্ত না হত, তাহলে এক ছট ছেলে মরে যেত ।
বাচ্চাটা বেছে গেল, আর উমাপ্রসাদও তখন বুঝল যে এই পাগলামিটা আর নিজে রুখতে পারবেন না – যতই প্রমাণ আনতেন, বাড়ির লোকজন বলত যে খালি এক দেবী এক অর্ধমৃত ছেলেকে বাঁচাতে পারতেন সেভাবে । সব আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে হুড়হুড় করে লোকে আশতে শুরু করলেন ‘দেবী’-কে দেখতে যাতে সে তাঁদের সব সমস্যাগুলো ঠিক করে দিতে পারতেন । পুরোপুরি দৈবক্রমে, সবাই পেতে থাকলেন যাকিছুর জন্য উপাসনা করছিলেন, যেটার জন্য অন্ধ বিশ্বাসটা আরও বাড়তে থাকল ।
উমাপ্রসাদ তাঁর বউকে সেখান থেকে বের করানো চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দয়াময়ীও একটু একটু বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে তিনি দেবী কারণ এত লোক বেঁচে গিয়েছিলেন তাঁর কাছে আশার পর । শেষে গিয়ে, খালি এক ট্রাজেডি এই বিশ্বাসটাকে ভাঙতে পারল, যখন দয়াময়ীর ভাগ্নে অসুস্থ হয়ে গেলেন । যদিও অনেক অন্য লোকরা বেঁচে গিয়েছিলেন তাঁর চরণামৃত খাওয়ার পর, সেই বাচ্চা ছেলেটা মরে গেলেন কারণ ডক্টরকে দেখানো হল না আর সে খালি খেল দয়াময়ীর চরণামৃত ।
সেই ছেলেটার মরার পর, ঠাকুর, যিনির স্বপ্নতে এই পাগলামিটা শুরু হল, নিজের বিশ্বাসটাকে একটু সন্দেহ করতে শুরু করলেন । উমাপ্রসাদও সাহস পেলেন, তাঁর এক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলার পর, তাঁর বাবাকে বলতে যে তাঁর অন্ধ বিশ্বাসের জন্য তাঁর নাতি মরে গেল আর যে তাঁর বউয়ের জীবনটাও নষ্ট করে দিচ্ছিলেন । অথচ, বেশি দেরিতে বিশ্বাসটা ভাঙ্গা হল – দয়াময়ী অর্ধেক পাগল হয়ে গিয়েছিলেন আর একা একা কুয়াশাতে দৌরে ছলে গেলেন সিনেমার শেষে ।
সিনেমার দুঃখজনক শেষ দেখাল ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপদ – একটা ছেলে মরে গেল কারণ অন্ধ বিশ্বাস মেনে চলছিলেন লোকজন, বিগ্যানের জায়গায়, এক ১৭ বছর বয়সী মেয়ের জীবন নষ্ট হল কারণ তাঁর পাগল শ্বশুরের কথায় আরও পাত্তা দেওয়া হল তাঁর নিজের ইচ্ছের চেয়ে, আর তাঁদের বিয়েটাও ভেঙ্গে গেল এই পাগলামিটার জন্য ।
আমি সিনেমার শুরু থেকেই মুগ্ধ ছিলাম কারণ এত ভয়ংকর ভাবে মা দুর্গার চোখ দেখানো হল । আমরা বাঙ্গালিরা বিশ্বাস করি যে মা দুর্গা আমাদের সুরক্ষা করে, আর তাঁকে নিয়ে যখন ভাবি, আমরা স্বস্ত বোধ করি । কিন্তু সিনেমার শুরুতে, এমনভাবে মা দুর্গার চোখগুল আর তাঁর বিসর্জনটা দেখাল, মনে হচ্ছিল যে কোনো ভয়ংকর বিপদ ছিল সে চোখগুলর মধ্যে । অপূর্ব ভাবে লাইটিং, আওয়াজ, আর অন্য সবকিছু ব্যাবহার করেছিলেন সত্যজিৎ রায় যাতে এই খ্যারেক্টারাইজেসানটা করতে পারলেন । দুর্গার চোখের সিম্বলিজেমের পরিবর্তনের এক গভীর অর্থ আছেঃ ধর্ম আর বিশ্বাসের দু মুখ আছে, একটা যেটা মানুষকে খুশি করায় আর আশা দেয় কঠিন সময়ে, আর অন্য একটা যেটা গোঁড়ামি থেকে ওঠে, যেটা জীবন নষ্ট করে, যেটার থেকে জাতপাত আর সতী এসেছিল আমাদের সমাজে । মা দুর্গার চোখ আমাদের নিরাপদ বোধ করায়, কিন্তু সত্যজিৎ রায় দেখাল যে এক ধর্ম অনেক খারাপ জিনিসও করতে পারে – যে ক্ষমতা মানুষের জীবনে আলো আন্তে পারে, সে ক্ষমতা জীবন ধ্বংসও করতে পারে ।
সিনেমার শুরুর একটা ছবি
আরেকটা জিনিস যেটা খুব ভালো দেখাল ছিল র্যাশনালিজেম আর গোঁড়ামির মধ্যে লড়াইটা । শুরু থেকেই, উমাপ্রসাদ চেষ্টা করছিলেন তাঁর বউয়ের জীবন উন্নত করতে, যেটার জন্য স্বপ্ন দেখছিলেন যে দয়াময়ী তাঁর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন । অথচ, দয়াময়ী বললেন যে তাঁর শ্বশুর এটাকে হতে দিতেন না – ঠাকুরের কোনো আগ্রহ ছিলেন না তাঁর পুত্রবধূর সুস্থতায়, তিনি খালি চায়তেন যে দয়াময়ী পুরো জীবন তাঁকে সেবা করুক (এক অংশে ঠাকুর বললেন “এক বুড়ো ছেলের একটা আবদার মাটিতে রেখো না।”) । উমাপ্রসাদ লিঙ্গ সমতার সমর্থক, ইতিমধ্যে ঠাকুর পিত্রিতন্ত্রের সমর্থক ।
আরেকটা জিনিস বেশ ভালো দেখানো হল, যে দয়াময়ীর কোনো ক্ষমতা ছিলেন না কারণ সে মহিলা, অশিক্ষিত এবং ক্ষমতাহীন । সিনেমাটা খুব ভালো দেখিয়েছে সেই যুগের সমাজিক অবস্থা এবং অন্যায় ।
ঠাকুরের অভিনেতাটা খুব ভালো দেখিয়েছেন যে ঠাকুর শুরু থেকেই পাগল ছিলেন, যে তিনি যখন পুজো করছিলেন, পাগলের মতনই দেখতে ছিলেন । ধর্ম ঠাকুরকে পুরো খেয়ে নিয়েছিলেন ।
আরেকটা জিনিস খুব স্পষ্টভাবে দেখে গেলঃ কিভাবে অন্ধ বিশ্বাস ছড়ায় । যদিও ঠাকুর শুরু করলেন পাগলামিটা, অন্য অনেক লোক ছিল ঘরে যারা বলতে পারতেন যে এটা ভুল ছিল, তো সবাই কেন গরুর মতন ঠাকুরের পেছন-পেছন ছললো? উমাপ্রসাদের দাদার কম ভ্যালুস ছিলেন, কিন্তু অনেক লোভ ঠাকুরের টাকা পয়সার জন্য, যেটার জন্য যে চামচা ছিলেন তাঁর বাবার জন্য । গ্রামের গরিব লোকেদের কম শিক্ষা ছিলেন আর তাঁরা এইসব কুসংস্কার শুনেই বড় হয়েছিলেন, তো তাঁদের কোনো ক্ষমতাই ছিলেন না র্যাশনালিজেম দিয়ে অন্ধ বিশ্বাসটাকে সমালোচনা করতে । এই পুরো দুর্যোগটা হল কারণ শিক্ষিত লোকেরা দুর্বল ছিলেন আর সত্য কথা বলেননি যখন এক হীন্ তথ্য শেখানো হচ্ছিল ।
অন্যদিকে, উমাপ্রসাদের বন্দু এবং শিক্ষকরা মানবতাবাদী ছিলেন । তাঁর এক বন্দুর সঙ্গে কথা বলছিলেন বিধবাদের পুনর্বিবাহ করার ক্ষমতা নিয়ে, একটা জিনিস যেটা সে সময়কারের সমাজে হতই না । আর তাঁর শিক্ষকের ঘরে চারিদিকে বই ছিল – দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে এটা একটা মানুষ যে অনেককিছু জানেন ঠাকুরের সম্পর্কে ।
সিনেমাটা বেশ ভালো লাগল আমার । যদি আপনাদের কোনো ভাবনা আছেন এই পোস্টটা নিয়ে, আমাকে এক চিঠি পাঠাতে পারেন আমার ইমেলে, chancellorceti <at> gmail.com ।